সর্বশেষ:
সোলায়মান শিপনের ছোটগল্প “ভালোবাসা”

সোলায়মান শিপনের ছোটগল্প “ভালোবাসা”

ভালোবাসা
সোলায়মান শিপন

‘তুমি কখনো প্রজেক্টরে তোমার স্বপ্ন দেখেছ?’
‘প্রজক্টরে স্বপ্ন!’
‘হ্যাঁ। প্রজেক্টরে স্বপ্ন। একটি প্রজেক্টরে ভেসে উঠবে তোমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নটি।’
‘আমি কখনো প্রজেক্টরে স্বপ্ন দেখিনি। আমি স্বপ্ন দেখি একটি খোলা মাঠে। একটি খোলা মাঠ- বিস্তৃত প্রান্তর। সেখানে দৌড়ে বেড়ায় একজন রাখাল ছেলে। এমন জীবন যাতে কোনো জটিলতা নেই।’
‘তোমার স্বপ্ন তাহলে জটিলতাবিহীন জীবন?’
‘হু। ঝামেলাবিহীন জীবনই আমার পছন্দের।’
‘পছন্দ নাকি স্বপ্ন, ঠিক করে বলো?’
‘স্বপ্নও বলতে পারো।’
‘আমি বললে তো হবে না। তোমাকে বলতে হবে।’
‘ভারি যন্ত্রণা শুরু করলে তো!’
‘কি! আমি যন্ত্রণা শুরু করেছি?’
‘কি শুরু করলে বলো তো।’
‘আমি শুরু করেছি! আমি! আমি! আমি!’
‘আচ্ছা তুমি শান্ত হও।’
‘নিজে থেকে শান্ত হতে পারব না। তুমি আমাকে শান্ত করো। আমাকে একটা চুমু খাও। চুমু খেলে আমার রাগ কমে।’
নওরোজ সুজানার চিবুকে হাত দিয়ে আলতো করে চুমু খেলো। সুজানা চুপচাপ বসে রইল। কিছুই বলল না।
‘কি রাগ কমলো?’
‘হু। কমেছে।’
নওরোজ একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘কখন যে তোমার রাগ উঠে আর কখন যে কমে সেটাই বুঝতে পারি না।’
সুজানা কিছু বলছে না। নওরোজ লক্ষ করে দেখলো সুজানা ঘুমিয়ে পড়েছে। বিছানায় শুয়ে পড়ার সাথে সাথেই ঘুম। সৃষ্টিকর্তার কি অপূর্ব নেয়ামত। এমনটা নওরোজের সাথে কখনো হয় না। প্রতিবারই ঘুমোতে যাবার পর তাকে আধ থেকে এক ঘণ্টা যাবত্ বিছানার এ পাশ, ও পাশ করতে হয়। তারপর যদি ঘুম বাবাজি দয়া করে তার চোখে এসে বসে তাহলে তো ভালোই। তবে ইদানিং অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে। মাঝেমধ্যে তাকে সারা রাতই নির্ঘুমভাবে কাটাতে হচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে- কে জানে।
নওরোজের মনে পড়ে গেল বিয়ের প্রথম রাতের কথা। নওরোজ সেদিন সারা রাত জেগে ছিল। সুজানা শুয়ে আছে আর নওরোজ মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
এই মেয়েকে ঘুমন্ত অকস্থায় এত সুন্দর লাগে কেন? অবশ্য সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে ঘুম ভাঙার পর। দীর্ঘ ঘুমের পর সুজানা যখন তার ফোলা ফোলা চোখ নিয়ে নওরোজের সামনে এসে দাঁড়ায় তখন তাকে দেখতে আরো বেশি সুন্দর লাগে। নওরোজ অবশ্য কখনোই এই কথা সুজানাকে বলেনি। ফোলা চোখে সৌন্দর্য। সুজানা নিশ্চয়ই অহেতুক পেঁচ খেলবে। এই মেয়ের এই একটাই দোষ। কথায় কথায় পেঁচ খেলা। নওরোজের অবশ্য মাঝে মাঝে খুবই ইচ্ছে করে সুজানার চোখে চোখ রেখে তাকে স্পষ্টভাবে বলতে, ‘দেখো মেয়ে আমার সাথে অহেতুক পেঁচ খেলবে না। আমি পেঁচ খেলার লোক না। আর তুমিও জিলাপী না। তুমি হচ্ছ সুজানা। তোমার নাম জিলাপী হলে অবশ্য ভিন্ন কথা ছিল।’
এমন আরো অনেক কথাই সুজানাকে এখনো বলা হয়নি। আচ্ছা- নওরোজ কি তার জীবনের সব না বলা কথাগুলো সুজানাকে বলে যেতে পারবে? তার হাতে কি সেই সময় আছে?
নওরোজের আজ খুব কচ্ছপ হতে ইচ্ছে করছে। শান্ত-শিষ্ট ও ঝামেলাবিহীন জীবন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জীবিত থাকা। নওরোজ তার অসুখটির কথা আজই জানতে পেরেছে। অসুখের কথাটি সুজানাকে এখনো বলা হয়নি। আসলে সে সুজানাকে বলতে গিয়েও বলতে পারেনি। কথাটি শোনার পর সুজানা অনেক কষ্ট পাবে। আচ্ছা বাসর রাতের কথা কি সুজানার মনে আছে। সে রাতে নওরোজ সুজানাকে একটি কবিতা শুনিয়েছিল।
‘কপাটহীন অস্থির একটি ঘর
কোনো সাপ সেখানে ঢুকতে পারবে না
হিস্ হিস্ করে বলতে পারবে না-
পাপ কোরো। পৃথিবীর সব আনন্দ পাপে
পুণ্য আনন্দহীন। উল্লাসহীন।
পুণ্য করবে আকাশের ফেরেশতারা-
কেননা পুণ্য করার জন্যই তাদের তৈরি করা হয়েছে।’
সুজানা বলল, ‘তোমার ধারণা কপাটহীন অস্থির একটা ঘরে আমাদের বাসর হচ্ছে? তুমি আসলে কি বোঝাতে চাইছ বলো তো।’
নওরোজ লজ্জায় পড়ে গেল। কিছুই বলতে পারল না।
সুজানা তখন নওরোজকে বলল, ‘আমার খুব রাগ লাগছে। আমাকে শান্ত করো।’
নওরোজ মিনমিনে গলায় তখন বলল, ‘কিভাবে শান্ত করব?’
‘আমাকে চুমু খাও। চুমু খেলে আমার রাগ কমে।’
নওরোজ অবাক দৃষ্টিতে সুজানার দিকে তাকালো। অদ্ভুত একটি মেয়ে। মেয়েটির ভেতরে খুব সহজে মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার আসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। নওরোজ বুঝতে পারল না সে এখন কি করবে? সে কি সুজানার কপালে চুমু খাবে।
‘কি হলো চুমু খাও।’
‘চুমু খাবো না।’
চুমু না খাওয়ার কারণ নওরোজের কাছে জানতে চাওয়া হবে এমনটাই তার ধারণা ছিল। তবে বাস্তবে সেটি ঘটল না। সুজানা খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তখন তাকে বলল, ‘চুমু না খেলে নাই। এমন চুমু বিয়ের আগে অনেক খেয়েছি।’
নওরোজের ছোট্ট মাথায় যেন বিশাল এক আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। তার মনে যখন যন্ত্রণার ঢেউ খেলা আরম্ভ করল ঠিক তখনই সুজানা তার এই যন্ত্রণার মাঝে কিছুটা ঘি ঢেলে দিলো। সে নওরোজের দিকে কিছুটা ঝুঁকে এসে ফিস্ ফিস্ করে বলল, ‘আজিজ ভাইয়া। সম্পর্কে আমার কাজিন হয়। উনার সাথেই বিয়ের আগে আমার সম্পর্ক ছিল।’
নওরোজ কিছুই বলতে পারল না। সে লক্ষ করল তার ভেতরে এক ধরণের সূক্ষè কষ্ট অনুভূত হচ্ছে। এই মেয়েকে সে বিয়ের আগে চিনতো না। বিয়ের আগে কারো সাথে সম্পর্ক থাকতেই পারে তাই বলে বাসর রাতে অন্য একজন পুরুষের চুমু খাওয়ার গল্প করাটা কি খুব বেশি জরুরি? অল্প বয়সের মেয়ে বিয়ে করার এই এক সমস্যা। কখন কি বলতে হবে তা তারা জানে না।
পরদিন সকালে নাস্তা করার পর সুজানাকে নিয়ে নওরোজ শ্বশুর বাড়িতে গেল। সারা রাস্তায় নওরোজ মন খারাপ করে বসে রইল। সুজানা এক বারের জন্যও তার মন খারাপের কারণ জানতে চাইল না। সুজানার এরূপ নিষ্ঠুর আচরণে নওরোজের মনের কষ্ট আগের চেয়ে আরো বাড়তে লাগল।
শ্বশুর বাড়িতে পৌঁছেই নওরোজ তার শালা-শালীদের কাছে তাদের কাজিন আজিজ সম্পর্কে জানতে চাইল। অনেক খোঁজ-খবর নেওয়ার পর নওরোজ আবিস্কার করল আজিজ নামে সুজানার কোনো কাজিন নেই্।
সুজানা নওরোজের বুকের উপর উবু হয়ে শুয়ে বলল, ‘শোনো ছেলে, এত ভয় পাবার কিছু নেই। আমার এক বান্ধবী আছে। ওর দাদার নাম আজিজ পাশা। বয়স আশির কাছাকাছি হবে। আমি তার নামই তোমাকে বলেছি। সে আমার বয় ফ্রেইন্ড না। সে আমাকে কখনো চুমুও খায়নি। তবে শুনেছি, সে নাকি এখনো তার পঞ্চান্ন বছর বয়সী স্ত্রীকে চুমু খায়।
নওরোজ মুগ্ধ হয়ে সুজানার কথা শুনছে। কত সুন্দর করেই না এই মেয়ে কথা বলে। হঠাৎ তার মনে হলো দোষটা আসলে তার নিজেরই। বাসর রাতে স্ত্রী স্বামীর কাছে চুমু খেতে চেয়েছে। চুমুটা দিয়ে দিলেই হতো। তা না করে সে মুখের উপর সরাসরি না করে দিয়েছিল। কাজটা করা তার মোটেও উচিত হয়নি। সে তার কৃতকর্মের উপযুক্ত শাস্তি পেয়েছে। এবার সবকিছু ঠিকঠাক হবার পালা। সে সুজানার চিবুক ধরে তার কপালে চুমু খেল।
সুজানা চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার কাছে মনে হলো তার সারাজীবনের সব চুমুগুলো থেকে এই চুমুটি আলাদা হয়ে থাকবে। সম্ভব হলে এই চুমুটিকে সে কোনো যাদুঘরে রেখে দিতো। সেটি সম্ভব হয়নি। তবে নওরোজেরও এই চুমুর কথাটি আজও মনে আছে। বাকী জীবনও মনে থাকবে।
বাকী জীবন! কত সময়ের হবে বাকী জীবন। কত বছর, মাস নাকি দিন। এ ব্যাপারে ডাক্তার তাকে স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। তবে নওরোজের যে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব কম তা সে ভালোভাবেই আঁচ করতে পারছে। নওরোজের ব্রেইন টিউমার ধরা পড়েছে। দেশে চিকিৎসা করে কোনো লাভ হবে না। চিকিৎসার জন্য তাকে অন্য কোনো দেশে নিয়ে গেলে অবশ্য বাঁচার সম্ভবনা আছে। কিন্তু সেটি সম্ভব নয়। নওরোজ একজন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। ডাক্তার তাকে যে দুটো দেশ চিকিৎসার জন্য সাজেস্ট করেছে। সেখানে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। ডাক্তার তাকে বলেছে আমেরিকা বা সিঙ্গাপুরে গিয়ে চেষ্টা করে দেখতে। অনেক টাকার দরকার। এত অল্প সময়ে তার পক্ষে এত টাকা জোগার করাটাও সম্ভব নয়। আচ্ছা সুজানা মেনে নিতে পারবে নওরোজের এ অসুখের কথা? সে কি নওরোজকে তার মত করেই ভালোবাসে, এমন অনেক চিন্তা দ্রুত গতিতে বাসা বাঁধছে নওরোজের মাথায়। বিরতীহীন ভাবনাগুলো তাকে এলাপাথারীভাবে আক্রমণ করে চলেছে। আবার নওরোজের কাছে মনে হলো, সুজানা তাকে পাগলের মত ভালোবাসে। হয়তো নওরোজই সুজানাকে কখনো তার মত করে ভালোবাসতে পারেনি।

নওরোজ আধ ঘণ্টা যাবত্ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। এ জায়গা থেকে সম্পূর্ণ শহরটাকে এক সাথে দেখা যায়। গভীর রাতেও বেলকনির সামনের রাস্তাটায় গাড়ি চলাচল করে। নওরোজ প্রায়ই এখানটাতে এসে দাঁড়ায়।
হঠাৎ নওরোজ তার কাঁধে সুজানার আলতো হাতের ছোঁয়া অনুভব করে। নওরোজের চোখে জল। তার খুব ইচ্ছে করছে সুজানার দিকে ঘুরে দাঁড়াতে। কিন্তু সে সেটি করতে পারছে না। মাথা প্রচ- ব্যথা করছে। তীক্ষè ব্যথা। সে কি সুজানাকে তার অসুখের কথা বলতে পারবে? ঘুরে দাঁড়ালেই সুজানা তাকে কান্নার কারণ জিঙ্গেস করবে। তখন নওরোজ কি বলবে? সুজানাকে তখন তার অসুখের কথা বলে দিতে হবে।
সুজানা পেছন থেকে নওরোজকে জাপ্টে ধরল। সুজানা নওরোজের পিঠে কান পেতে তার হৃদস্পন্দন শুনতে পারছে। সে কি নওরোজের হদস্পন্দনের কথাগুলো বুঝতে পারছে। সে কি বুঝতে পারছে নওরোজের মনের কথা। সে কি বুঝতে পারছে তার কপালে চুমু খেয়ে তাকে নওরোজের খুব বলতে ইচ্ছে করছে- তোমাকে খুব ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি তোমাকে। খুব খুব খুব বেশি ভালোবাসি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 kantarpollinews
Design BY NewsTheme