সর্বশেষ:
প্রেমনিবাস (অনুগল্প)

প্রেমনিবাস (অনুগল্প)

আর কতো দেরি বাপু, বয়স তো কম হলো না, এবার সুখের একটা ঘর পাত। মায়ের এমন কথায় একটু হুমড়ি খেয়ে পড়লো জুগেন। নত মস্তকে পায়ের দিকে তাকিয়ে দুই ঠোঁটের মাঝ গহব্বরে দাঁত আর জিভ দিয়ে জাবর কাটতে লাগলো।
তারপর অস্ফুটে বললো,” গ্রীষ্মের দহনে প্রকৃতি তৃষ্ণায় যখন জল জল করবে তখন পাতাবো উৎকৃষ্ট সংসার। মা রেগে গেলেন। অমন নয় ছয় ঘোরপ্যাচের কথা বার্তা একদম বুঝতে পারলো না। মায়ের রাগ ভাঙাতে কপালে চুমু খেয়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল জুগেন,” দেখো মা,তোমার কষ্টগুলো আমি বুঝি। দিনভর বিছানায় পড়ে থেকে তোমার আর কাটছে না। কি করবো মা, আজকাল মেয়েরা আর মেয়ে নেই। পুরুষের সমান অধিকার চাইতে চাইতে এরা বোধ হয় নারী পুরুষদের গভীর সম্পর্কের বাইরে অন্য পৃথিবীতে চলে গেছে। এখন আর এরা সংসার বুঝেনা। এখন আর….

মা কথা কেড়ে নিয়ে বলল,” যাইহোক, তুই যেমন বুঝিস বাপ!
আমি যে তোর সুখ দেখে যেতে চাই!
অন্তত ওপারে এইটুকু সস্তি পাবো।
মানুষের অভিলাসের তো আর শেষ নেই। তাছাড়া ক্যান্সার রোগী আর ক’দিন বাঁচে? জুগেনের চোখে জলের কোলাহল। চিবুকে গড়িয়ে পড়া মায়ের চোখের জল মুছতে মুছতে ও বলল,” না মা, অমন কুলক্ষনে কথা বলো না। আমি যে বড় অসহায় হয়ে যাবো। কি করবো মা বলো! সাপের আশীতে বিষ থাকে। স্বর্ণাভারে যতই রমনী তুষ্ট হয়, ততই অসুরের মতো লোভীত হয়! তখন দেবালয়ে আর অর্ঘ্য দেয় না কেউ। সব অলীক হয়ে যায়।
জুগেনের বাবা পাশের ঘরে রান্না করছিলেন। বেশ বয়স হয়েছে উনার। এই বয়সে কই একটু বিশ্রাম নিবে, তা আর ভাগ্যে নেই। রান্না বান্না থেকে বাড়ির সমস্ত কাজ করতে হয়।

এইতো গেলো সেদিন জুগেনের বাবা
বলছিলেন,” আমরা হলাম স্নেহনীড়,
স্নেহের পরশে সবাই সতেজ থাকুক এটাই কাম্য। কিন্তু আর সয় না! বোধ হয় কষ্ট পাবার জন্যেই ইশ্বর আমাদের বৃদ্ধ করে দিলেন। ঘাটের মড়া হয়েও নিস্তার নেই। আর ছাপোষা লোকের অতো আহ্লাদ থাকতে নেই। তা শুধু চক্ষুশূলই হয়ে ওঠে। উনুনে একটু বেশি আঁচ পড়াতে
মাছ ভাজা থেকে কেমন যেনো পোড়া পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে।
জুগেন দৌড়ে এসে দেখে বাবা চোখের জলে মাছ ভাজছেন।হাতের ভাজাকাটা কেড়ে নিয়ে ও ভারী গলায় বলল,” যাও বাবা। আমি রান্না করে আনছি। তুমি একটু বিশ্রাম নাও। বাবা সহাস্যে বলল, না না, তা কেন বাপ? এটা বরং আমি করি। ও আমার গা সওয়া! তারচে তুই একটু বিশ্রাম নি। সারাদিন কত্ত কাজ করতে হয় অফিসে। কত্ত চাপ!
বাবার কথায় অবাদ্য হবে এমন সাহসও নেই। কি আর করা! দুঃখ সমেত হাসি মুখে জুগেন আবার মায়ের কাছে চলে যায়। মা স্মিত হেসে বলে উঠলো,” কিরে? তোর বাবার রান্না হলো? আজকাল, ঢের অলসতা করে ও। যাক, তুই আবার কিছু বলিস না। এই বয়সে এইটুকু করছে তাই তো অনেক। কেইবা করে?

মায়ের কথাগুলো শুনে জুগেন একগাল হেসে মাকে বলল,” আচ্ছা মা, তোমার মাথা উসকো খুসকো লাগছে। তেল মেখে দিচ্ছি। ভীষণ ঠান্ডা লাগবে মাথা। আর শরীরও ভালো লাগবে। মা বলল,” তুই? না বাবা। তুই সারাদিন কতো খাটিস?
দেখেই বুঝা যায় কতো ধকল যাচ্ছে তো উপর। জুগেন তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে মায়ের চুলে বিলি কেটে বলে,” মা তোমরা কি বলোতো? বাবার মতো তুমিও? আমি যদি মেয়ে হতাম তাহলে রোজ দিতাম নিশ্চয়ই!
মেয়ের থেকে মায়ের যা প্রাপ্তি সেগুলো ঠিক পেতে, মা।
অসুস্থ মা ভাবনার গভীরে ডুবে ততোক্ষণে অনুভব করলো মেয়ের অভাব। নৈসর্গিক মায়া মোহ কেবল একটা অনুভূতি জাগ্রত করে। তৃষ্ণা।
এ অতি পরম তৃষ্ণা বয়সফেরে হয়না। জীবনের যেকোনো বসন্তদিনের ফুল ফোঁটা মুখরিত সময়েও হতে পারে। জুগেন কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। শাক দিয়ে মাছ ঢেকে দিবে, নাকি মা যে নিরাশার রাত্রিতে আশার প্রদীপ জ্বেলে স্বপ্নভঙের জল ফেলছে তা মুছে দিবে? জুগেন আবার বলে মাকে,” আমি চাই আমাদের পরিবার নদীর কল্লোল শব্দের মতো ভালোবাসা বয়ে আনুক। পাখির কূজন আমাদের চারদিক মুখরিত করে রাখুক। হীরার দ্বারা শোভিত হোক আমার হিরন্ময়ী মা বাবা। আমাদের বাড়ি হোক প্রেমনিবাস।


লেখক: মোঃ হাসান মাসুদ

রচনাকালঃ ২৯/০৩/১৯ খিঃ
বড়চওনা/সখিপুর/টাংগাইল।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 kantarpollinews
Design BY NewsTheme